সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ , ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না : মির্জা ফখরুল শিশুর হাতে স্মার্টফোন : আশীর্বাদ না অভিশাপ? হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি টাঙ্গুয়ার হাওরে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগ সাম্রাজ্যবাদী ও দেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবি “সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ” গুপ্ত ছিলাম, বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও পালাবো না : জামায়াত আমির প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন যাঁরা বিদ্যুতের দাম বাড়লো দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২১৫ জন তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৪৮৭ কোটি টাকা মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ গণমাধ্যম, পুলিশ ও প্রবাসীদের উদ্যোগে অসহায় সাজু মিয়ার মুখে হাসি হাওরপাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস যাত্রী ওঠানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১২, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর ১০টি পৌরসভার পানি সরবরাহ লাইনে ত্রুটি, দুর্ভোগে ৬ শতাধিক গ্রাহক স্থানীয় সরকার নির্বাচন : আগস্টের শেষে তফসিল, অক্টোবরে ভোটের চিন্তা হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা : এমপি কামরুল

হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ

  • আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:০৩:৩০ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:০৯:৪০ পূর্বাহ্ন
হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ
বিশ্বজিত রায়::
সুনামগঞ্জের হালি হাওর পারের কালীপুর গ্রামের আতাশা মিয়া জমি আবাদ করেছেন চৌত্রিশ কিয়ার। বিশ-বাইশ কিয়ারের মতো কাটতে পেরেছেন। অতিবৃষ্টিতে কাটা ধানের অধিকাংশ নষ্ট হয়েছে। রোদ না থাকায় কালচে হওয়া ধান খলায় শুকাতে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।
মন ভালো নেই জানিয়ে আতাশা মিয়া বলেন, জ্যৈষ্ঠ মাসের চৌদ্দ, এখনও লইতাছি (কাটা, মাড়াই, শুকানো)। বারো-চৌদ্দ কিয়ার লইতে পারছি না। সারাতাই ক্ষতি। যা খরচ হইছে তার কিচ্ছুই পাইছি না। সব নষ্ট। মন ভালা আছে! ঈদ করতাম। ঈদ হইছে না এইবার।
জলাবদ্ধতায় ফলন তলিয়ে নষ্ট হওয়ায় ঈদ উৎসব ছিল না সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার অধিকাংশ কৃষক পরিবারে। হাওরে থৈথৈ অবস্থা বিরাজ করলেও এখনও কেটে রাখা ধানের স্তূপ পানি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন অনেকে। নষ্ট ধান রোদে শুকাতে ব্যস্ত রয়েছেন কেউ কেউ।
ফলনের বড় অংশ হারিয়ে এমনিতেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কৃষক। এর মাঝে খড় না থাকায় গৃহপালিত পশু পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি গোখাদ্যের অভাবে পড়ে উভয় সঙ্কটের কথা জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষেরা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি সহায়তার তালিকা নিয়েও ক্ষোভ আছে তাদের। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। জেলায় বোরো চাষী প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে কার্ডধারী কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। এদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কর্তনের বাকি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্থাৎ ১৬ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে দাবি কৃষি বিভাগের।

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে ফলন তলিয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে লক্ষাধিক কৃষক পরিবারের। কিন্তু সরকারি সহায়তার তালিকায় নাম উঠেনি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের। অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এমন লোকজনের নাম তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ এনে ক্ষোভ জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা থেকে সহায়তার জন্য চূড়ান্ত হয়েছে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জন কৃষক। প্রতিজনকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল তিন মাস দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন।
গত রোববার দুপুরে জামালগঞ্জের হালি হাওরের সদরকান্দি এলাকায় গিয়ে কথা হয় কৃষক মো. আলাল মিয়ার সাথে। বাঁধ কেটে দেওয়ায় ভাসমান হাওরে তিন ছেলেকে নিয়ে বুকসমান পানিতে ডুবে যাওয়া ধানের স্তূপ থেকে কাটা ধান টেনে নৌকায় তুলছিলেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে সদরকান্দি গ্রামের ওই কৃষক বলেন, ঈদ করুম কইদ্দে! ঈদ কইতে পারি না, কইদ্দে যে গেছে। ধান টাইন্যাই বর পাই না। ধান লইয়া ব্যস্ত।
আলাল মিয়ার পরিবারে সদস্য সংখ্যা দশ জন। আবাদকৃত ২৫ কিয়ার জমিই তার জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। পঁচিশ কিয়ারের (২৮ শতকে কিয়ার) মধ্যে পাঁচ কিয়ার জমির ধান মেশিন দিয়ে কেটে তুলেছেন। বাকি জমির ধান কিছু তলিয়েছে, কিছু কাটতে পারলেও শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেখতাছেন না ছুইক্কারারে (তিন ছেলে) নিয়া পানি থাইক্যা ধান তুলতাছি। এইখানে প্রায় সাত-আট কিয়ার জমির ধান কাইট্যা রাখছিলাম। বান্ধ কাইট্যা দেওয়ায় ডুইব্যা গেছে।
রোদে মেলে দেওয়া ধানে পা বুলাচ্ছিলেন হালি হাওর পারের কালীপুর গ্রামের কিষাণী মিনারা বেগম। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঈদ আর কি। গাধলায় (অতিবৃষ্টি) তো ঈদ খাইয়ালাইছে। ঈদ করুম কইত্থে। ঈদ করতে ট্যাহা লাগে না। তেরো কিয়ার জমি করছালাম। চার কিয়ার কাটছে। এই ধান আনছে। বাকি ধান নষ্ট হইছে।

ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের কৃষক চন্দন তালুকদার বলেন, বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে অনেকের জমিজমার ধান নষ্ট হয়েছে। খোরাকের ধান কোনরকম তুলতে পারলেও জমি করতে যে খরচ হয়েছে তা পোষানো সম্ভব না। সব ধান কাটতে না পারায় প্রয়োজনীয় খড়ও পাওয়া যায়নি। গোখাদ্যের অভাবে ছোট-বড় ১২টি গরুর মধ্যে ৪টা বিক্রি করে দিয়েছি। আরও কয়েকটা বিক্রি করব। কিন্তু দাম কম। বিক্রি করতে মন চাইছে না। গরু পালনের মতো খড়ও (গোখাদ্য) নাই। তাই বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হবে। তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সুলেমানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মহালিয়া হাওর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি সিরাজুল হক বলেন, একফসলী এলাকা হওয়ায় আমরা এই বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল। এবার বৃষ্টিতে বেশির ভাগ কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খানি-খোরাক ও খরচাপাতির টান তো সবারই আছে। এর মাঝে গরু-বাছুরের খানিও (খড়) নাই। তাই কম দামে অনেকেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে মানুষের মন-মানসিকতা ভালা না। এবারের ঈদও ভালো কাটেনি মানুষের।
ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের মধ্যে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের তালিকা অনুমোদন হয়েছে। অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পেলে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স